জাহেলী যুগে নারীদের অবস্থা

জাহেলী যুগে নারীদের অবস্থা

আরবের জনগণ বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে বসবাস করত। প্রতিটি শ্রেণির অবস্থা ছিল অন্য শ্রেণির চেয়ে আলাদা। অভিজাত শ্রেণিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট উন্নত। এ শ্রেণির নারীদের স্বাধীনতা ছিল অনেক। তাদের কথার মূল্য দেওয়া হতো। তাদের এতটা সম্মান করা হতো এবং নিরাপত্তা দেওয়া হতো যে তারা পথে বের হলে তাদের নিরাপত্তার জন্য তলোয়ার বেরিয়ে পড়ত। প্রয়োজনে রক্তপাত হতো। কেউ যখন নিজের দানশীলতা ও বীরত্ব প্রসঙ্গে প্রশংসা করত তখন সাধারণত নারীদের সম্বোধন করত। নারীরা ইচ্ছা করলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাতের আগুন জ্বালিয়ে দিত। এ সব কিছু সত্ত্বেও পুরুষদেরই মনে করা হতো পরিবারের প্রধান এবং তাদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে মান্য করা হতো।



জাহেলিয়াতের যুগে স্বামীর তালাক অথবা মৃত্যুর পর তার পছন্দানুযায়ী অপর কোনো পুরুষের নিকট বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নারীদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। ফলে একজন নারী তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামীহারা হলে তাকে অসহনীয় যন্ত্রণা ও সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হত এবং তাকে বাধ্য হয়ে অতি কষ্টে কালাতিপাত ও জীবন-যাপন করতে হত।

কিন্তু ইসলাম নারীদের এ দুর্ভোগের প্রতিকার করে তাদের লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার হাত থেকে উদ্ধার করেছে। ইসলাম তাদের পুনরায় নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ করে দেয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছবে তখন তোমরা তাদেরকে বাধা দিয়ো না যে, তারা তাদের স্বামীদেরকে বিয়ে করবে যদি তারা পরস্পরে তাদের মধ্যে বিধি মোতাবেক সম্মত হয়। এটা উপদেশ তাকে দেওয়া হচ্ছে, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে। এটি তোমাদের জন্য অধিক শুদ্ধ ও অধিক পবিত্র। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।  (সূরা আল-বাকারাহ আয়াত নং ২৩২)।

বলাবাহুল্য ইসলাম যে যুগে মানব জীবনের এই বিষয়টির আইনসম্মত ধারাসমূহ জনসমুক্ষে উপস্থাপন করেছে, সে যুগে ববাহ ব্যবস্থার মৌলক উদ্দেশ্যই একেবারে বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। সুখ-শান্তি ও পরিতৃপ্তির অনুভুতি স্বামী-স্ত্রীর অন্তর থেকে একেবারে তিরোহিত হয়ে গিয়েছিল। নারী-পুরুষের দু‘টি পরিবাব ও দু‘টি জীবনে গড়ে উঠা আত্নীয়তা ও সহমর্মিতাসুচক স্নেহমমতা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। বৈবাহিক সম্পর্ক ও সম্বন্ধের কোনো শুভ ধারাই আর অবশিষ্ট ছিল না। এমন কি বৈবাহিক সম্পর্কের মূল স্বরুপ ইজ্জত সম্নান পর্যন্ত নির্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুধু মাত্র খোসা পড়ে রয়েছিল আর মহৎ গুনাবলী সমূহ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

সর্বক্ষেত্রে নারী সমাজ পুরুষদের যুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। পুরুষ পুরুষ নয় বরং অসহায় ও দুর্বল শ্রেণীর প্রতি বনের হিংস্র যন্তুর ন্যায় ছিল। সমগ্র দুনিয়ার লোকালয়ের এ ছিলো এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ ক্ষেত্রে  ভাল-মন্দ ও সভ্য-অসভ্য সমাজে বিশেষ কোনেনা পার্থক্য ছিল না। চতুস্পদ জন্তু ও গৃহের অন্যান্য আবসবাবপত্রের মতো নারীরা পণ্য-সামগ্রী ছিল। সময়ে অসময়ে পুরুষরা নারীদের ওপর স্বীয় কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ হেতু জোর-যবরদস্তী চালাতো। এমনিকি নারীদেরকে জঘন্য দেহব্যবসা গ্রহণের জন্যও বাধ্য করা হতো। অর্থাৎ স্বীয় যৌনবৃত্তি চরিতাতার্থ করার সাথে সাথে অর্থোপার্জনের মাধ্যম হিসাবেও পুরুষরা ওই অসহায় নারীদের যথেষ্ট ব্যবহার করতো।

বর্বর জাহেলী যুগে নারীদেরকে পশুর ন্যায় একটি জীব বিশেষ মনে করা হতো, যার উদ্দেশ্য ছিলো মানব বংশ বিস্তার এবং পুরুষের সেবা করা। আর এজন্যই কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়া লোক-সমাজে লজ্জার কারণ ছিল। কন্যা সন্তানের ভুমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই তাকে জীবন্ত কবর দিত এবং জীবন্ত কবর দেয়াকে গৌরব ও আভিজাত্যের প্রতীকরুপে মনে করতো। বর্বরতার ইতিহাসের এই বিশেষ অধ্যায়টি সম্পর্কে নিছক কোরআন থেকে যে জ্ঞানটুকু লাভ করা যায় শিক্ষা ও ‍উপদেশের ক্ষেত্রে তা-ই যথেষ্ট।



ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী সে যুগে আরব রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যসহ সমগ্র বিশ্বে সমভাবে নারীর অবস্থা ছিল সীমাহীন অবমাননাকর ও হ্রদয়বিদারক। তারা ভোগের সামগ্রী ও অস্থাবর সম্পত্তি হিসাবে পরিগণিত হতো। সমাজে তাদের কোন রকম মান মর্যাদা বা অধিকার ছিল না। একজন পুরুষ যত খুশি বিয়ে করতো এবং যত খুশি তালাক দিতে পারত। তৎকালীন আরবে চার ধরনের ববাহ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। বর্তমান সমাজের মতো এক স্বামী-স্ত্রীর বিয়ে এটা সমাজের শহরবাসী অভিজাত শ্রেণীর মাঝে প্রচলিত ছিল। একজন স্ত্রীলোক একাধিক পুরুষের বিয়ে করতো। কয়েক বন্ধূ একত্র হয়ে একজন মহিলাকে বিয়ে করতে পারত। এতে করে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণে স্বভাবতই জটিলতার সৃষ্টি হতো। এ জটিলতার সমাধানকল্পে রমণীটি গর্ভবতী হওয়ার পর যাকে গর্ভস্থ সনতানের পিতা হিসাবে নির্দেশ করতো সে ব্যক্তিই উক্ত সন্তানের পিতা বলে গণ্য হতো।

আলোচনাটি ভালো লেগে থাকলে অনেক অনেক শেয়ার করবেন এবং কমেন্ট করবেন। আপনাদের এই সুন্দর কমেন্ট আমাদেরকে নতুন আলোচনা করতে মোটিভেট করে এবং সব সময় আলোর বাণীর সঙ্গে যুক্ত থাকবেন ধন্যবাদ।

Leave a Comment