ক্যাস্টর ওয়েলের ব্যবহার বিধি

Kastor ayel beboharer niyam

ক্যাস্টর ওয়েলের ব্যবহার বিধি

ক্যাস্টর অয়েলের মূল ব্যবহার সাবান, লুব্রিক্যান্ট, হাইড্রলিক ও ব্রেক ফ্লুইড, রং, কালি, ঔষধ, ইত্যদি তৈরিতে। এর থেকে প্রাপ্ত উপাদান ত্বক ও চুলের জন্য উপকারি হওয়ায় বর্তমানে ক্যাস্টর ওয়েল কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে বিভিন্ন দামী দামী সৌন্দর্য প্রসাধনী তৈরিতে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এ ছাড়াও শিল্পের উপাদান হিসাবে ক্যাস্টর ওয়েলের ব্যবহার আছে। প্রাচীন মিশরে এক সময় ক্যাস্টর অয়েল প্রদীপ জ্বালাতেও ব্যবহার করা হত। কখনও কখনও গর্ভবতী মহিলাদের প্রসব যন্ত্রণা হ্রাস করতে ক্যাস্টর তেল বা রেডির তেল ব্যবহার করা হতো। জানা যায়, চোখের জ্বালা দূর করার জন্য প্রাচীন মিশরীয়রা এক সময় রেডির তেল বা ক্যাস্টর ওয়েল ব্যবহার করতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা তার নিজস্ব স্মৃতিচারণ আমার ছেলেবেলায়ও ক্যাস্টর অয়েলের নাম এসেছে, ওষুধ হিসেবেই।

নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে ক্যাস্টর ওয়েল ব্যবহার রয়েছেঃ

ত্বকের যত্নেঃ ব্রণ সমস্যা বা সান-বার্ণের জন্য ক্যাস্টর ওয়েল ব্যবহার করা হলে মুখের শুষ্কতা দূর হয় ও ত্বকের মসৃণতা ফিরে আসে। যে সব লোকেদের ত্বকে ব্রণ হবার সম্ভাবনা, তারা ভয়ে মুখে কোনো রকম তেল লাগাতে পারেন না; তারা খুব সহজেই ক্যাস্টর ওয়েল ব্যবহার করতে পারেন। ক্যাস্টর অয়েল ত্বকের জন্য ময়শ্চারাইজ হিসাবেও কাজ করে।

বয়স ধরে রাখতেঃ ক্যাস্টর ওয়েলে আছে অ্যাণ্টি এজিং প্রপার্টি (Anti Aging Property)। নিয়মিত ত্বকে রেড়ির তেল বা ক্যাস্টর ওয়েল লাগানো হলে এই তেল ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে কোলাজেন ও ইলাস্টিনের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। ফলে ত্বকে বলিরেখা আসতে দেরি হয় বলে ত্বকে বেশি সজীবতা ও মসৃণতা থাকে।

কোষ্ঠকাঠিন্যেঃ যাদের দীর্ঘদিন যাবৎ কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ক্যাস্টর অয়েল সেবন প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে। তবে এক্ষেত্রে ক্যাস্টর অয়েল অল্প মাত্রায় গ্রহণ করা উচিৎ। তা না হরে মাথা ঘোরা, পেট ব্যাথা, বমিবমি ভাব এবং ডাইরিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

ক্ষত সারাতেঃ ক্যাস্টর অয়েলে আছে নতুন পেশি বা কলা গঠনের ক্ষমতা। তাই কোথাও কেটে বা পুড়ে গেলে এই তেল অল্প মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

চুল ও স্ক্যাল্পের যত্নে ক্যাস্টর ওয়েলের ভূমিকা ও ব্যবহারঃ

ক্যাস্টর ওয়েলের বিশেষ ব্যবহার রয়েছে কেশ বিন্যাসে ও কেশ চর্চায়। এ ক্ষেত্রে ক্যাস্টর ওয়েল অদ্বিতীয়। যুগ যুগ ধরে সমাদৃত। এই কারণে অনেকেই একে চুলের প্রকৃতিক কন্ডিশনারও বলেন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, চুল পড়ার অন্যতম কারণ মাথার বা স্ক্যাল্পের ইনফেকশন। বিশেষত ব্যাক্টেরিয়া, ফাঙ্গাস, ইত্যাদির সংক্রমন। মাথায় অন্যান্য সমস্যা থাকলেও চুল পড়ে, যেমন স্কাল্পের শুষ্কতা। শুধু চুল পড়াই না, চুলের স্বভাবিক বৃদ্ধির হারও হ্রাস পায়, চুলে অকাল পক্কতা আসে। এ সব ক্ষেত্রে ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহারের ফলে অদ্ভুত একটা ফল পাওয়া যায়, কারণ ক্যাস্টর ওয়েলে আছে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণাগুণ; ক্যাস্টর ওয়েল ইনফেকশন প্রতিরোধ করে। আবার ক্যাস্টর অয়েল ত্বকের গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে স্ক্যাল্পের নিউট্রিশনের ব্যালেন্স ঠিক রাখে, চুলের শুষ্কতা কম হয়, ও চুল পড়াও কমতে থাকে। ফলে চুল ঘন ও উজ্জ্বল হয়, কেশ-সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পায়।

হেয়ার মাস্ক হিসাবে কেশ চর্চায় ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহারঃ

ক্যাস্টর ওয়েল সংযোগে নিম্নোক্ত দুই ধরনের হেয়ার মাস্ক বা চুলের মাস্ক তৈরি করা ও ব্যবহার করা যায়। এ গুলো ব্যবহারে চুলের ক্ষেত্রে উপকারও কম নয়।

ক) অ্যালোভেরা ও ক্যাস্টর অয়েল মাস্ক (Aloe Vera And Castor Oil Hair Mask)

এক্ষেত্রে সম পরিমাণে অ্যালোভেরা (Aloe Vera) জেল  ও ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহার করতে হবে। উভয় একত্রে মিশিয়ে নিয়ে এটা দিয়ে মাসাজ করার পর মাথা হট টাওয়েলের সাহায্যে জড়িয়ে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট রেখে দিতে। এর পর শ্যাম্পু করে চুল ধুয়ে নিতে হবে।

খ) মেথি, নারকেল তেল ও ক্যাস্টর অয়েলের মিশ্রণ (Fenugreek, Coconut Oil And Castor Oil Hair Mask)

এটি তুলনামূলক জটিল। কোন পাত্রে ২ টেবিল চামচ নারকেল তেল (Coconut Oil), ২ টেবিল চামচ ক্যাস্টর অয়েল (রেড়ির তেল) ও সামান্য মেথি নিয়ে একত্রে ফোটাতে হবে। এই মিশ্রণ ঠান্ডা করে পাত্রে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে এই মিশ্রণ তেল মাথায় মাসাজ করা হলে উপকার পাওয়া যাবে।

মিশ্রণ হিসাবে ক্যাস্টর ওয়েল ব্যবহারঃ

ক্যাস্টর ওয়েলকে অন্যান্য দ্রব্যের সাথে মিশিয়েও কেশ চর্চায় ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে এই ধরণের মিশ্রণ ব্যবহার হচ্ছে। যেমন, সাধারণ কনডিশনারের সাথে ক্যাস্টর ওয়েল মিশ্রণ। এ ক্ষেত্রে বাজার থেকে কেনা কনডিশনারের সাথে এক টেবিল চামচ ক্যাস্টর অয়েল (রেড়ির তেল) যোগ করে বোতলটি ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিতে হবে। শ্যাম্পু করার পর পর এই মিশ্রণ চুলে ব্যবহার করা হলে ত্বরিৎ ও ব্যাপক ফলাফল আসবে। এছাড়াও চুলে ক্যাস্টর অয়েল মাসাজ করলে চুলের ডগা ফাটে হ্রাস পাবে, ক্ষতিগ্রস্থ ও রুক্ষ চুলে আর্দ্রতা আসবে, চুল মোলায়েম এবং উজ্জ্বল হবে। ক্যাস্টর ওয়েলের দ্বারা ম্যাসাজ করা হলে চুলের ফলিকলে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়, ফলে চুলের পুষ্টি সরবরাহও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়াও স্ক্যাল্প বা মাথায় ত্বকে যে ড্যানড্রাফ বা খুশকি হয়, ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহার সেই খুশকিও দূর করতে সাহায্য করে।

২ থেকে ৩ টেবিল চামচ ক্যাস্টর অয়েল নিয়ে তার সাথে ৪ ফোঁটা গ্লিসারিন একত্র করেও মিশ্রণ তৈরি করা যায়। এর বাইরেও দুই টেবিল চামচ ক্যাস্টর অয়েলের সাথে দুটো ডিম ফেটিয়ে নিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা যায়। অথবা যোগ করা যায় এক টেবিল চামচ মধু। চুলে ব্যবহারে এই সকল মিশ্রণও ব্যাপক উপকারী।

মানতেই হবে কেশ চর্চায় ক্যাস্টর ওয়েল অতুলনীয় একটি উপাদান। শুধু আজ নয় যুগ যুগ ধরেই এটি চলছে। আর কেশ চর্চায় এই গুণাগুণের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ সহ আন্তর্জাতিক বাজারেও নানান ব্র্যান্ডের ক্যাস্টর ওয়েল পাওয়াও যাচ্ছে। এর মূল্যও যে অনেক বেশি এমন নয়।আসুন আমরা ক্যাস্টর ওয়েল সম্পর্কে আরো স্পষ্টভাবে জানি। আমাদের দৈনন্দিন জীবন চর্চায় ক্যাস্টর ওয়েলকে ব্যবহার করি আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের কেশ চর্চার স্বার্থে।

Leave a Comment